২০২৫ সাল বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য একটি অস্থির ও উদ্বেগজনক বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। বাউল সম্প্রদায় থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক সংগঠন, গণসংগঠন এবং স্বাধীন শিল্পচর্চা—সব ক্ষেত্রেই বছরজুড়ে বাধা, হামলা ও হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার ধারাবাহিকতায় সংস্কৃতির বহমান ধারায় গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে।
বছরের বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাজারে হামলার ঘটনা আলোচনায় আসে। সেপ্টেম্বরে রাজবাড়ীতে নুরাল পাগলার মরদেহ কবর থেকে তুলে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে নিন্দার জন্ম দেয়। সর্বশেষ ডিসেম্বরের শেষ দিকে ঠাকুরগাঁওয়ে বাবা শাহ সত্যপীরের মাজারে হামলা হয়, যা সংস্কৃতিচর্চা ও সহনশীলতার প্রশ্নে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করে।
মার্চ মাসে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত ও শরীরচর্চা শিক্ষক নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন ও নাগরিক গ্রুপ বিক্ষোভ-সমাবেশ করে। বক্তারা তখন বলেন, সাংস্কৃতিক শিক্ষা ও সৃজনশীলতার বিকাশ ছাড়া মানবিক ও গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ে ওঠা সম্ভব নয়। তবে বছরজুড়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে উল্লেখযোগ্য নাট্য বা সাংস্কৃতিক আয়োজনের অভাব চোখে পড়ে।
বাউল ও লোকসংগীত শিল্পীদের ওপর হামলা ছিল ২০২৫ সালের অন্যতম উদ্বেগজনক দিক। ময়মনসিংহের তারাকান্দায় বাউল ফকির হালিম উদ্দিন আকন্দের মাথার জট জোর করে কেটে দেওয়ার ভিডিও ভাইরাল হলে সামাজিক মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। মানিকগঞ্জে বাউল শিল্পী আবুল সরকারের গ্রেপ্তার ও তাঁর অনুসারীদের ওপর হামলার ঘটনাও ব্যাপক আলোচিত হয়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাউলদের অনুষ্ঠান বন্ধ, হুমকি ও অপমানের ঘটনা ঘটে।
শাহবাগে ‘গানের আর্তনাদ’ কর্মসূচিতে হামলার প্রতিবাদে আয়োজিত অনুষ্ঠান পণ্ড হওয়া এবং কয়েকটি স্থানে নাটক মঞ্চায়ন স্থগিত হওয়া সাংস্কৃতিক অস্থিরতার চিত্র তুলে ধরে।
বছরের শেষ দিকে পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে। ১৮ ডিসেম্বর রাতে ছায়ানট সংস্কৃতি ভবনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ এবং পরদিন উদীচীর কার্যালয়ে অগ্নিকাণ্ডে ৫৭ বছরের নথিপত্র পুড়ে যায়। নিরাপত্তাজনিত কারণে বিদেশি শিল্পীদের কয়েকটি কনসার্টও বাতিল করা হয়।
সব মিলিয়ে ২০২৫ সাল বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য এক দুঃসময়ের বছর। তবে হামলা ও বাধার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের চেষ্টাও চলমান ছিল, যা ভবিষ্যতের জন্য আশার ইঙ্গিত দেয়।