আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও বর্ষীয়ান রাজনীতিক তোফায়েল আহমেদের বিরুদ্ধে দুই যুগ আগের দুর্নীতির মামলায় বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে গুরুতর অসুস্থ ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এই প্রবীণ নেতাকে মামলায় ‘পলাতক’ হিসেবে দেখানো নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সচেতন মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
ঢাকা বিভাগীয় স্পেশাল জজ বেগম শামীমা আফরোজ গত ৭ মে তিন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন। মামলার পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ২২ জুন দিন ধার্য করা হয়েছে।
মামলার অপর দুই আসামি হলেন মোহাম্মদ আনোয়ারুল ইসলাম ও মোশাররফ হোসেন। তাদের মধ্যে মোশাররফ হোসেন জামিনে থেকে আদালতে হাজিরা দেন। তবে তোফায়েল আহমেদ ও আনোয়ারুল ইসলাম আদালতে উপস্থিত না থাকায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বহাল রয়েছে।

দুদকের কৌঁসুলি ইশতিয়াক আহমেদ জানান, অভিযোগ গঠনের বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষ শুনানি করেছে। অন্যদিকে জামিনে থাকা আসামির আইনজীবী অব্যাহতির আবেদন জানান। পলাতক হিসেবে দেখানো দুই আসামির পক্ষে শুনানি সম্ভব হয়নি। পরে আদালত অভিযোগ গঠনের আদেশ দেন।
এদিন তোফায়েল আহমেদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার বিষয়েও আদালতে আবেদন করা হয়। তার আইনজীবী খায়ের উদ্দিন শিকদার আদালতে জানান, দীর্ঘদিন ধরে তিনি ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আবেদনে বলা হয়, স্ট্রোকজনিত জটিলতায় তার স্মৃতিশক্তি লোপ পেয়েছে এবং তিনি কাউকে চিনতে পারছেন না। এমনকি মামলার কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার মতো শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতাও তার নেই।
তবে আদালত আইনানুগ প্রক্রিয়ায় আবেদন দাখিলের পরামর্শ দিয়ে মামলার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেছেন বলে জানিয়েছেন দুদকের কৌঁসুলি।
২০০২ সালে তৎকালীন দুর্নীতি দমন ব্যুরোর দায়ের করা এ মামলায় অভিযোগ করা হয়, ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে অবৈধভাবে অর্জিত ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা গোপন ও স্থানান্তরে জড়িত ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, সহযোগীদের মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকের মতিঝিল কর্পোরেট শাখা থেকে বিভিন্ন সময়ে অর্থ স্থানান্তর ও উত্তোলন করা হয়। তদন্ত শেষে তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।
পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে উচ্চ আদালতের নির্দেশে মামলার কার্যক্রম দীর্ঘদিন স্থগিত ছিল। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার হওয়ায় মামলাটি আবার সচল হয়।

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম ছাত্রনেতা ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক তোফায়েল আহমেদ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের একজন। ডাকসুর সাবেক ভিপি হিসেবে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে তার ভূমিকা ব্যাপকভাবে আলোচিত। তিনিই রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু উপাধি ঘোষণাকারী ছাত্রনেতাদের অন্যতম ছিলেন। স্বাধীনতার পর তিনি নয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং বিভিন্ন মেয়াদে মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক বছর ধরেই তিনি হুইলচেয়ারে চলাফেরা করতেন। স্ট্রোকের পর শরীরের একাংশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়লে তার চলাফেরার সক্ষমতা আরও কমে যায়। বর্তমানে তিনি গুরুতর শারীরিক অবনতির মধ্য দিয়ে সময় পার করছেন।
এমন বাস্তবতায় একজন প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা ও অসুস্থ রাজনীতিককে ‘পলাতক’ হিসেবে চিহ্নিত করার বিষয়টি মানবিক ও নৈতিক প্রশ্ন তৈরি করেছে বলে মনে করছেন অনেকেই। আইনগত প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলেও, জীবনের অন্তিম প্রান্তে দাঁড়িয়ে ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রকে ঘিরে এই পরিস্থিতি জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে।