সর্বশেষ

কথার কাঁটা ও চুলের চিৎকার: একখানা রূপক-রসগল্প

প্রকাশিত: ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ০২:৫৮
কথার কাঁটা ও চুলের চিৎকার: একখানা রূপক-রসগল্প

বাংলাদেশে এখন কথার রূপক বাড়িয়াছে ব্যাপকভাবে। মুখে এক কথা, মনে আরেক ভাব। ফলে সাধারণ মানুষ কথার অর্থ বুঝিতে বুঝিতে গলদঘর্ম। কথার কূল পাইতে না পাইতেই মাথা চুলকাইয়া চুল খসাইতেছে। ইহাতে লাভবান হইতেছে শুধু চুল গজানোর তেল ও শ্যাম্পু কোম্পানিগুলা।

 

একদিকে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলিয়াছেন, “রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট দেওয়া মানেই নাগরিকত্ব দেওয়া নয়।” শুনিয়া জনতা ভাবিতেছে, “তাহা হইলে পাসপোর্ট কীসের পরিচয়?” একজনে বাংলাদেশী পাসপোর্ট দেখাইয়া বলিবে, “আমি আম্রিকার নাগরিক।” আরেকজন গুয়েতেমালার পাসপোর্ট দেখাইয়া বলিবে, “আমি গিনিবিসাউয়ের নাগরিক।” এখন ইহা থামাইবে কে?

 

এই সুযোগে গোঁফে তা দিতেছে ভিসামুক্ত বিশ্ব আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ। তাহারা বলিতেছেন, “আমাদের স্বপ্ন স্বার্থক হইয়াছে। পাসপোর্ট মানেই এখন পাসওয়ার্ড, যাহা খুলিলেই বিশ্ব নাগরিকত্ব।” ইউসুফ সরকারকে ধন্যবাদ দিয়া তাহারা একখানা স্মারক ডিমের পিঠা উৎসবও আয়োজন করিয়াছেন।

 

অন্যদিকে জামায়াতের আমির চুম্বা শফিক সাহেব বলিয়াছেন, “নারীরা আমাদের কাছে নিরাপদ। তাহাদের অধিকার রক্ষায় আমরা সর্বোচ্চ করিবো।” কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে যোগ করিয়াছেন, “তবে ভোটের মাঠে নারীদের প্রার্থী করিবার ক্ষেত্রে কিঞ্চিত ব্যত্যয় আছে। দল প্রধান করিবার, ক্যারিয়ারে সফল হইবার, উচ্চশিক্ষায়, অর্থনীতিতে, সমাজনীতিতে—ইত্যাদি ক্ষেত্রেও ব্যত্যয়ের বিধান আছে।” শুনিয়া নারীরা বলিতেছেন, “আমরা নিরাপদ, কিন্তু বন্দী।”

 

ডাকসু নেতারা শিক্ষাঙ্গণে লাঠিসোটা লইয়া শৃঙ্খলা ফিরাইতেছেন। তাহারা বলিতেছেন, “শিক্ষার্থীর কাজের অংশ হিসাবে আমরা নির্বাচনি আসনেও ভলেন্টিয়ার সার্ভিস দিতেছি।” অর্থাৎ, ছাত্র রাজনীতি এখন গণসেবায় রূপান্তরিত। লাঠি এখন সেবার প্রতীক আর ভোট এখন ব্যথার মলম।

 

এদিকে সরকার প্রধান বলিয়াছেন, “সারাবিশ্ব বাংলাদেশকে নিবার জন্য যে হুড়াহুড়ি করিবার কথা, সে কর্মসূচীতে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটিয়াছে।” শুনিয়া জনগণ ভাবিতেছে, “তাহা হইলে কি আমরা এতটাই আকর্ষণীয় যে বিশ্ব আমাদের নিতে চায়?” কিন্তু পরক্ষণেই উনি বলিয়াছেন, “দেশের মানুষ চোর, ছ্যাচ্চোড়, ইহাদের নিবার গরজ নাকি বিদেশের নাই।” এখন জনগণ বুঝিতে পারিতেছে না তাহারা কি বিশ্ববাসীর আকর্ষণ না কি আতঙ্ক?

 

এইরূপ কথার মায়াজালে জনতা বিভ্রান্ত। কথার রূপকে তাহারা অকূল পাথারে খাবি খাইতেছে। “নিবার” মানে কি “নেওয়া” না কি “বাঁচানো”? “ব্যত্যয়” মানে কি “বাধা” না কি “বৈধতা”? “নাগরিকত্ব নয়” মানে কি “নাগরিকত্ব হইতে পারে”? এইসব প্রশ্নে জনতা মাথা চুলকাইতেছে, চুল খসাইতেছে আর চুল গজানোর তেল কোম্পানি বিজ্ঞাপন দিতেছে, “রূপক বুঝুন, চুল গজান!”

 

তাই এখন প্রয়োজন একখানা “কথা ব্যাখ্যা কমিশন”। এই কমিশন ব্যাখ্যা দিবে কোন কথার মানে কী, কোন রূপক আসলে কাকে খোঁচা দিতেছে, কোন ব্যত্যয় আসলে কতটা ব্যাথা। তাহারা বলিবে, “চুম্বা শফিকের ‘নিরাপদ’ মানে ‘নির্বাক’, পররাষ্ট্র উপদেষ্টার ‘পাসপোর্ট’ মানে ‘পাসওয়ার্ড’, সরকার প্রধানের ‘নিবার’ মানে ‘নির্বাসন’।”

 

এইভাবে আমরা বুঝিব, কথার কাঁটা কোথায়, ব্যাথার ব্যাকরণ কী আর চুল খসাইবার কারণ কোথায়। তাহা হইলে আমরা চুল গজানোর তেল নয়, বুদ্ধি গজানোর পাঠ নেব।

 

লেখকঃ এক ক্লান্ত পেনসিল - চুল নয়, মগজ হারাইয়া উদভ্রান্ত

সব খবর