সর্বশেষ

এ দাসত্বের মহিমা হইতে পরিত্রাণ চাহিনা

প্রকাশিত: ৯ এপ্রিল ২০২৬, ২৩:২৭
এ দাসত্বের মহিমা হইতে পরিত্রাণ চাহিনা

এই দেশ বড়ই বিচিত্র। এখানে ইতিহাসের চেয়েও স্মৃতিভ্রংশ দ্রুত ঘটে, আর যুক্তির চেয়েও বক্রোক্তি অধিক স্থায়ী। একদা যাহারা উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করিতেন “উন্নয়ন মানে তো জনগণের টাকায়ই হয়, ইহাতে কারো দয়া কিসের?” তাহারা আজকাল নীরবতার কঠোর ব্রত গ্রহণ করিয়াছেন। মনে হয়, সেই ট্যাক্সের টাকা আজও যাইতেছে, কিন্তু উন্নয়ন নামক বস্তুটি কেমন করিয়া যেন রাস্তায় হারাইয়া গিয়াছে।

 

পূর্বকালে একদা এক নেত্রীর নাম লইয়া বলা হইত তিনি নাকি পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, উড়ালপুল, কর্ণফুলী টানেল প্রভৃতি করিয়াছেন। তখনকার বিদগ্ধ সমালোচকবৃন্দ তৎক্ষণাৎ তাহা খণ্ডন করিয়া বলিতেন “এগুলি কি তাহার বাপের টাকায় নির্মিত? ইহা তো জনগণের ট্যাক্সের টাকা!” শুনিয়া আমরা মুগ্ধ হইতাম। কি অসাধারণ অর্থনৈতিক বোধ! কি গভীর গণতান্ত্রিক চেতনা!

 

অদ্য, সেই একই জনগণ যথারীতি ট্যাক্স প্রদান করিতেছেন। ইনকাম ট্যাক্স রিটার্ন জমা দিতেছেন, ভ্যাট দিতেছেন, নানা প্রকার শুল্ক দিতেছেন। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয়, বাজারে তেল নাই, বিদ্যুৎ নাই, কর্মসংস্থান নাই। মেট্রোরেল তো দূরের কথা কমলাপুর হইতে একটি নিয়মিত ট্রেন ছাড়াইতে গিয়াও রাষ্ট্রীয় যন্ত্রণা হিমশিম খাইতেছে। তখন প্রশ্ন জাগে ট্যাক্সের টাকাটি কোথায় যাইতেছে? না কি ট্যাক্স এখন একপ্রকার দার্শনিক ধারণা, যাহার বাস্তব প্রয়োগ নাই?

 

একদা বলা হইত “ঋণ নিলে দেশ বিক্রি হয়।” এখন দেখা যাইতেছে ঋণ না লইলেও দেশ কেমন করিয়া যেন বিক্রির পর্যায়ে উপনীত হয়। পূর্বে উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়ন লইয়া যত অভিযোগ ছিল, এখন তাহা স্মৃতির অ্যালবামে স্থান পাইয়াছে। কারণ বর্তমানের বাস্তবতা আরও অভিনব! এখন তেল কিনিতেও অনুমতি লাগে, বিদ্যুৎ কিনিতেও অনুমতি লাগে, অর্থনীতি চালাইতেও অনুমতি লাগে।

 

শোনা যায়, আন্তর্জাতিক পরাশক্তির অনুমতি ব্যতীত কিছুই করা দুষ্কর। আজ রাশিয়ার তেল কিনিতে অনুমতি প্রয়োজন, কাল হয়তো পেঁয়াজ আমদানির পূর্বে অনুমোদন লাগিবে, আর পরশু হয়তো বিবাহের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক সম্মতি আবশ্যক হইবে। তখন বিয়ের কার্ডে লেখা থাকিবে “অনুমোদিত বিয়ে, সংশ্লিষ্ট পরাশক্তির সৌজন্যে।”

 

মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে টান পড়িয়াছে ইহাও এক নতুন বাস্তবতা। যেই প্রবাসী শ্রমিকদের রেমিট্যান্সে এই দেশের অর্থনীতি সচল থাকে, তাহাদের জন্য দরজা সংকুচিত হইতেছে। অথচ দেশে কর্মসংস্থান নাই। অর্থাৎ, দেশে থাকিলে কাজ নাই, বিদেশে যাইতে গেলেও সুযোগ নাই। ইহাকে অর্থনীতির ভাষায় কি বলা যায়, তাহা অর্থনীতিবিদগণই বলিবেন, আমরা সাধারণ মানুষ ইহাকে বলি “দুই দিকেই অন্ধকার”।

 

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, এখন আর কেহ সেই পুরাতন প্রশ্নটি করেন না “কার বাপের টাকায় উন্নয়ন?” কারণ বাস্তবতা এতদূর অগ্রসর হইয়াছে যে, এখন প্রশ্ন হইতে পারে “কার অনুমতিতে রাষ্ট্র চলিতেছে?” ট্যাক্সের টাকা যে জনগণই দেয়, তাহা সকলেই জানে। কিন্তু সেই টাকার উপর জনগণের অধিকার কতখানি, তাহা এখন এক গভীর রহস্য।

 

অতএব, আমরা এক নতুন যুগে প্রবেশ করিয়াছি যেখানে উন্নয়ন ছিল জনগণের টাকায়, আর বর্তমান পরিচালিত হয় অনুমতির ভিত্তিতে। স্বাধীনতার পর এতবড় স্বাধীনতা আমরা আর কবে পাইয়াছিলাম যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার অন্যের উপর ন্যস্ত করিয়া আমরা নিশ্চিন্তে থাকিতে পারি!

 

এই পরম নিশ্চিন্ততার মাঝেই জনগণ আজ বসিয়া ভাবিতেছে ট্যাক্স দেই আমরা, কষ্ট করি আমরা, অথচ সিদ্ধান্ত নেয় অন্যে। ইহাই বোধহয় আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সর্বোচ্চ উৎকর্ষ যেখানে দায়িত্ব থাকে জনগণের, আর ক্ষমতা থাকে অনুমতির কাছে।

 

এবং আমরা, চিরচেনা এই দেশের মানুষ, আবারও নীরবে, নির্বিকারভাবে, ইতিহাসের এই অভিনব প্রহসন উপভোগ করিতেছি।

 

লেখকঃ এক ক্লান্ত পেনসিল; মুক্ত করো হে দাসের জীবন

সব খবর