সর্বশেষ

ব্যঙ্গ কলাম

আমরা ভাঁড়, আমাদের লইয়া আনন্দ করো বিশ্ব

প্রকাশিত: ৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৩০
আমরা ভাঁড়, আমাদের লইয়া আনন্দ করো বিশ্ব

বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডটি আজ বিশ্বের সর্বাধুনিক রাজনৈতিক বিজ্ঞানের পরীক্ষাগার। এইখানে গবেষণার জন্য কোনো ইঁদুর, খরগোশ বা বানরের প্রয়োজন নাই; আমাদের আছে ১৮ কোটি গিনিপিগ। ইহারা এমন এক বিশেষ প্রজাতি, যাহাদের উপর যেকোনো পরীক্ষা চালানো যাইবে—কোনো অনুমতি, কোনো নৈতিকতা, কোনো সংবেদনশীলতার প্রশ্ন নাই। ইহারা সংবেদনশীলতার ঊর্ধ্বে উঠিয়া গিয়াছে। ইহাদের দেহে এন্টিবায়োটিক প্রবেশ করিলে তা ততক্ষনাৎ মরিয়া যায়, কিন্তু ইহারা হাসিমুখে বাঁচিয়া থাকে।

 

আমরা জাতি হিসেবে যেন একখানি চর্মগোলক। ফুটবল মাঠে সবাই লাথি মারিয়া জালে ভরিতে চায়। ক্যারামের বোর্ডে আমরা সেই রেড, যাহাকে সবাই বাড়ি দিয়া গর্তে ফেলিতে চায়। ব্যাডমিন্টনের সাটলের মতোন আমরা আকাশে উড়িয়া আবার মাটিতে পড়ি, সবাই পিটাইয়া আনন্দ পায়। কিংবা বানর নাচের ঘন্টি—যাহা বাজাইয়া বাজাইয়া সবাই বানর নাচাইতে চায়। আমরা সেই ঘন্টি, আমরা সেই সাটল, আমরা সেই রেড।

 

প্রতিবেশীদের প্রতিনিধি আসিলে আমাদের নেতাগণ হঠাৎ করিয়া উসাইন বোল্ট হইয়া যান। শত মিটার দৌড়াইয়া গিয়া নাকে খত দেন, লাল গালিচা বিছাইয়া দিই, গলিয়া যাই, ঝুলিয়া থাকি। আমরা যেন মন্দিরের ঘন্টা বা মসজিদের পাপোস—কারণে অকারণে বাজাইয়া বা পা মুছিয়া পার হইয়া যায়।

 

বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি এখন আর ল্যাবরেটরিতে নাই, আছে বাংলাদেশে। এখানে নির্বাচন একটি সফটওয়্যার আপডেট। ভোটাররা গিনিপিগ, ব্যালট বাক্স হলো টেস্ট টিউব আর প্রার্থীরা হইলো পরীক্ষার রাসায়নিক দ্রব্য। ফলাফল নির্ধারণ হয় কে কত দ্রুত গলিয়া পড়িতে পারে। বিদেশি পর্যবেক্ষকরা আসিয়া নোট নেন, রিপোর্ট লেখেন আবার হাসিমুখে বিদায় নেন। আমরা খুশি, তাঁহারা খুশি।

 

আমাদের জাতি সংবেদনশীলতার ঊর্ধ্বে উঠিয়া গিয়াছে। অন্য দেশে মানুষ গুলি খাইলে কাঁদে, আমরা গুলি খাইলে হাসি। অন্য দেশে মানুষ বিদ্যুৎ না পাইলে প্রতিবাদ করে, আমরা বিদ্যুৎ না পাইলে মোমবাতি জ্বালাইয়া রোমান্টিক পরিবেশ সৃষ্টি করি। অন্য দেশে মানুষ কর দিতে গিয়া ক্ষুব্ধ হয়, আমরা কর দিতে গিয়া আনন্দ পাই—কারণ আমরা জানি, কর খাইয়া নেতারা মোটা হইবেন, মোটা হইয়া তাঁহারা আবার আমাদের উপর বসিবেন।

 

তুরুষ্ক, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ—সবাই আমাদের নিয়ে খেলিতে পারে। আমরা হাসিমুখে খেলার পাত্র হই। তাঁহারা আমাদের উপর গবেষণা করেন, আমাদের দিয়ে তাঁহাদের কূটনীতি চালান। আমরা খুশি, তাঁহারা খুশি। আমরা সারাবিশ্বে এক খুশিময় পরিবেশ বজায় রাখি।

 

আমরা এতই খুশি যে, বিশ্ববাসীও আমাদের খুশি করিয়া নোবেল পুরস্কার দেয়। আমরা শান্তি বজায় রাখি, যদিও শান্তির মধ্যে মৃদুমন্দ গুলি চলে, বোমা পড়ে, মানুষ মরে। কিন্তু আমরা বলি, “ইহা শান্তিরই অংশ।” আমরা শান্তি বজায় রাখি, আমরা নোবেল জিতি।

 

বিশ্ববাসী আমাদের দিকে চাহিয়া থাকে, নতুন খেলা দেখিবার আশায়। আমরা বলি, আসো খেলো, আমাদের লইয়া খেলো, আমাদের বাজাও, মারো, কাটো। তবু সকলে আনন্দে থাকো।

 

লেখক: এক ক্লান্ত পেনসিল; ভাঁড় হইয়া দাঁড়াইয়া থাকি ইতিহাসের পথে

সব খবর