সর্বশেষ

মহাজনের মরীচিকা ও রোহিঙ্গা শিবিরের ‘সেমাই-বিপ্লব’

প্রকাশিত: ২২ মার্চ ২০২৬, ২১:৩২
মহাজনের মরীচিকা ও রোহিঙ্গা শিবিরের ‘সেমাই-বিপ্লব’

মানুষের আশার গুড়ে বালি পড়া দেখিলে পাষাণ হৃদয়েও দীর্ঘশ্বাস জাগে, কিন্তু সেই বালি যদি হয় সুদি মহাজনের আশ্বাস-মিশ্রিত, তবে তাহা আর বিষাদ থাকে না—পরম কৌতুকে পরিণত হয়। গত বৎসরের সেই মাহেন্দ্রক্ষণের কথা স্মরণ করুন, যখন গ্রামীণ অর্থনীতির জাদুকর, অন্ধজনের নয়নমণি, শান্তিতে নোবেলজয়ী ডক্টর মুহাম্মাদ ইউনূস সাহেব রোহিঙ্গা শিবিরে পদধূলি দিয়াছিলেন। তাঁহার সেই অভয়বাণী—‘আগামী ঈদ রোহিঙ্গাগণ স্বদেশে পালন করিবেন’—শুনিয়া মজলুম রোহিঙ্গাদের মনে যে আনন্দের হিল্লোল বহিয়া গিয়াছিল, তাহা দেখিলে মনে হইত বুঝি নাফ নদীর জলও খুশিতে উথলাইয়া উঠিয়াছে।

 

রোহিঙ্গাগণ মহাজনকে ‘জিন্দা পীর’ মানিয়া লইল। তাহারা ভাবিল, যিনি ক্ষুদ্রঋণ দিয়া গরিবের হাঁস-মুরগি চরাইবার ব্যবস্থা করেন, তিনি নিশ্চয়ই বার্মার জান্তাদেরও সুদে-আসলে বুঝাইয়া দিবেন। ব্যস! শুরু হইল ‘সেমাই-বিপ্লব’। পঞ্জাবীর হাতা গুটাইয়া-লুঙ্গি কষিয়া বাঁধিয়া রোহিঙ্গাগণ ভাবিল—যাওয়ার সময় তো হইল, এখন পাথেয় সংগ্রহ করা আবশ্যক। স্বদেশে ফিরিয়া প্রথম ঈদ বলিয়া কথা! সেমাই-চিনি ছাড়া কি উৎসব জমে?

 

ফলশ্রুতিতে, কক্সবাজারের স্থানীয় অর্থনীতিতে এক অলৌকিক জোয়ার আসিল। এতদিন যাহারা মুদি দোকানে মাছি তাড়াইত, তাহারা রাতারাতি কোটিপতি হইবার স্বপ্নে বিভোর হইল। বস্তা বস্তা চিনি আর ক্যানভাসের ব্যাগের চাহিদা এমন বাড়িল যে, মনে হইল টেকনাফ বুঝি অচিরেই সিঙ্গাপুর হইয়া যাইবে। গ্রামীণ মহাজনের সেই চিরায়ত ‘ঋণ বিতরণ কার্যক্রম’—যাহাকে অনেকে আদর করিয়া সুদি কারবার বলে—তাহাতে নব্য প্রাণ সঞ্চার হইল। সেলাই মেশিন বিক্রয় হইতে শুরু করিয়া হাঁস-মুরগির খামার—সর্বত্রই ‘প্রগতি’র জয়গান। এমনকি পরিবহন খাতেও আসিল বিপ্লব। টেকনাফ টু কক্সবাজার রুটে নতুন করিয়া নিবন্ধিত হইল ‘বাবার দোয়া মিনিবাস’ ও ‘আল্লার নামে চলিলাম’ টেম্পো সার্ভিস। উদ্দেশ্য একটাই—রোহিঙ্গাদের সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছাইয়া দেওয়া।

 

তবে সমাজের একদল স্বার্থান্বেষী মহলের মাথায় হাত পড়িল। রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘিরিয়া যাহাদের আখের গোছানো চলিতেছিল, সেইসব এনজিও-জীবী ও বাড়িওয়ালারা প্রমাদ গুণিল। রোহিঙ্গারা চলিয়া গেলে তাহাদের উপরি পাওনা ও সস্তা শ্রমের কী হইবে? জুম্মার নামাজ শেষে মোনাজাতের ‘ডিউরেশন’ বাড়িয়া গেল। মুসল্লিগণ দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া বলিতে লাগিলেন, “আহা! মুসলিম ভাই ভাইদের এইভাবে আলাদা করা কি ইউনূস সাহেবের উচিত হইল? ইহারা তো আমাদের মেহমান!” স্বার্থের টানে ভ্রাতৃত্ববোধ যে কতটা প্রগাঢ় হইতে পারে, তাহা চর্মচক্ষে না দেখিলে বিশ্বাস করা কঠিন।

 

কিন্তু বিধাতা অলক্ষ্যে হাসিতেছিলেন। কালক্রমে দেখা গেল, মহাজনের সেই আশ্বাস ‘ঋণখেলাপি’র মতো হইয়া দাঁড়াইল। সময় বহিয়া গেল, ঈদ আসিল ও গেল, কিন্তু রোহিঙ্গাদের কপালে স্বদেশের মাটি জুটল না। উপরন্তু, ‘শান্তির দূত’ মহাজন নিজেই এখন ক্ষমতার অন্ধকারে দিশা হারাইয়া হিমশিম খাইতেছেন। রোহিঙ্গাদের কথা ভাবিবার ফুরসত তাঁহার কোথায়?

 

এখনকার দৃশ্যপট বড়ই করুণ ও হাস্যকর। রোহিঙ্গাগণ স্বদেশে ফিরে নাই ঠিকই, বরং তাহাদের অভ্যর্থনা জানাইতে আরও লক্ষাধিক নতুন রোহিঙ্গা সীমানা পার হইয়া বাংলাদেশে জাঁকাইয়া বসিল। যাওয়ার নামগন্ধ নাই, বরং আগামী কোরবানির ঈদে পশুর হাটের ইজারা লইয়া রোহিঙ্গা শিবিরে সংঘাত শুরু হইয়াছে। ভ্রাতৃত্ববোধ এখন লাঠালাঠিতে রূপান্তরিত হইয়াছে, আর মহাজনের জাদুর কাঠি এখন ভাঙিয়া দুই টুকরা।

 

পরিশেষে, কৌতূহলী একদল রোহিঙ্গা প্রতিনিধি যখন ঢাকার ‘যমুনা’ গেস্ট হাউসে মহাজনের হালনাগাদ তথ্য জানিতে গেল, তাহারা স্তম্ভিত হইয়া দেখিল—বিশাল গেটে বড় করিয়া সাইনবোর্ড ঝুলিতেছে: “TO-LET”। অর্থাৎ, পুরাতন বাসিন্দা পলাতক বা অন্যত্রে সরিয়া গিয়াছেন, বাসা ভাড়া দেওয়া হইবে।

 

এখন প্রশ্ন থাকিল—সেই শত শত টন বস্তাবন্দি সেমাই-চিনির কী দশা হইবে? পিঁপড়ারা কি মহাজনের আশ্বাসের ন্যায় সেই চিনি চুষিয়া খাইবে? সমাজ বিশ্লেষক হিসেবে বলিতে পারি, সুদি মহাজনের প্রতিশ্রুতি আর আকাশের মেঘ—উভয়ই ক্ষণস্থায়ী। তাহারা বৃষ্টি নামাইয়া মাটি ভিজায় না, বরং মাঝপথে উধাও হইয়া রৌদ্রের দহন বাড়াইয়া দেয়।

 

রোহিঙ্গারা এখন সেমাই ভিজাইয়া খাইতেছে আর ভাবিতেছে—আহারে মহাজন! চটের বস্তা আর ক্যানভাসের ব্যাগগুলি অন্তত দিয়া গেলে বাজারে বেচিয়া সুদের কিস্তিটা দেওয়া যাইত।

 

লেখকঃ এক ক্লান্ত পেন্সিল, বঞ্চিত, প্রতারিত এক প্রলেতারিয়েত

সব খবর

আরও পড়ুন

এক চিরস্থায়ী হাহাকারের উপাখ্যান

অপ্রাসঙ্গিকতার প্রাসঙ্গিকতা এক চিরস্থায়ী হাহাকারের উপাখ্যান

সংকটে দেশের জন্য কার্যকর প্রমাণিত শেখ হাসিনার উদ্যোগ

মৈত্রী পাইপলাইন এখন জ্বালানি নিরাপত্তার ভরসা সংকটে দেশের জন্য কার্যকর প্রমাণিত শেখ হাসিনার উদ্যোগ

বিক্রির হিসেব নিয়ে একাডেমির শুভঙ্করের ফাঁকি, দেনা নিয়ে ঘরে ফিরছেন প্রকাশক

কেমন হলো একুশের বইমেলা? বিক্রির হিসেব নিয়ে একাডেমির শুভঙ্করের ফাঁকি, দেনা নিয়ে ঘরে ফিরছেন প্রকাশক

গণতন্ত্রের চড়ুইভাতি ও একবিংশ শতাব্দীর মহাহাস্যকর মহড়া

সঙ-সদ গণতন্ত্রের চড়ুইভাতি ও একবিংশ শতাব্দীর মহাহাস্যকর মহড়া

রবীন্দ্রনাথের চিত্রাঙ্গদা, টেনিসনের ‘দ্য প্রিন্সেস’ এবং আন্তর্জাতিক নারী দিবসে বাংলাদেশের নারীর অবস্থান

রবীন্দ্রনাথের চিত্রাঙ্গদা, টেনিসনের ‘দ্য প্রিন্সেস’ এবং আন্তর্জাতিক নারী দিবসে বাংলাদেশের নারীর অবস্থান

মধ্যপ্রাচ্যের দাবার ছক ও বঙ্গীয় তৌহীদি জনতার বিপাক

মধ্যপ্রাচ্যের দাবার ছক ও বঙ্গীয় তৌহীদি জনতার বিপাক

ঐতিহাসিক ৭ মার্চ স্বাধীনতার সংগ্রামের অমর আহ্বান

ঐতিহাসিক ৭ মার্চ স্বাধীনতার সংগ্রামের অমর আহ্বান

আজকের বাংলাদেশ; বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন

আজকের বাংলাদেশ; বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন