সর্বশেষ

ব্যঙ্গ কলাম

বিশ্ব হিংসায় জর্জরিত, কারণ আমরা জিরোতে হিরো!

প্রকাশিত: ৯ জানুয়ারি ২০২৬, ২৩:১৭
বিশ্ব হিংসায় জর্জরিত, কারণ আমরা জিরোতে হিরো!

যখন বিশ্ব একত্র হইয়া জলবায়ু, যুদ্ধ ও যক্ষ্মা মোকাবিলায় ব্যস্ত, তখন বাংলাদেশ একা চলিবার মহোৎসবে মগ্ন। আমরা বিশ্বাস করি—“যাহারা একা চলে, তাহারাই ইতিহাস গড়ে।” অতএব, আমরা ইতিহাস গড়িতেছি এবং বিশ্ব আমাদের সেই ইতিহাসে হিংসায় জর্জরিত হইয়া কাঁদিতেছে।

 

বাংলাদেশের বর্তমান সরকার দেশের মান-মর্যাদা এমনভাবে উর্ধ্বে তুলিয়াছে যে, মর্যাদা এখন গগনচুম্বী। এই মর্যাদার তেজে উন্নত বিশ্বের সরকারসমূহ চোখে রোদচশমা না পরিয়া আমাদের দিকে চাহিতে পারে না। তাঁহারা আমাদের প্রবাসীদের ফিরাইয়া দিতেছেন, কারণ তাঁহারা বুঝিয়াছেন—বাংলাদেশী প্রবাসীরা শিক্ষায়, দীক্ষায়, রুচিতে, রন্ধনে, রম্যরচনায় এমন উচ্চস্তরে পৌঁছাইয়াছে, যাহা তাঁহাদের নিজস্ব নাগরিকদের আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরাইতেছে।

 

শ্রমবাজারে আমাদের কর্মীরা এতই দক্ষ, তাঁহারা কাজ করিয়া শুধু কোম্পানির লাভ বাড়ান না, কোম্পানির মালিকের আত্মীয়স্বজনেরও ভাগ্য বদলাইয়া দেন। এই ভয়েই উন্নত দেশসমূহ আমাদের শ্রমিক লইতে ভয় পান। তাঁহারা জানেন, একবার বাংলাদেশী শ্রমিক ঢুকিলে, তাঁহার কর্মঠতা ও সততায় স্থানীয় শ্রমিকেরা চাকরি হারাইবেন এবং সরকার হারাইবে ভোট।

 

আমাদের সরকারও বুঝিয়াছেন, এই শ্রেষ্ঠত্ব রক্ষা করিতে হইলে অন্য দেশে মানুষ পাঠানো বন্ধ করিতে হইবে। তাই তাঁহারা আশেপাশের দেশসমূহকে বলিয়াছেন—“তোমরা আমাদের কাতারে উঠিতে পারিবে না, অতএব তোমাদের জন্য ভিসা নাই।” এইভাবে তাঁহারা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করিতেছেন এবং প্রতিবেশী দেশসমূহকে শিখাইতেছেন—“নিজে বাঁচো, অন্যকে বাঁচিতে দিও না।”

 

ক্রিকেটেও আমরা বিশ্বকে শিক্ষা দিতেছি। আমাদের জাতীয় দলকে অন্য দেশে পাঠানো বন্ধ করিয়াছি, কারণ তাঁহারা যেইখানে যান, সেখানকার খেলোয়াড়েরা তাঁদের খেলা দেখিয়া এতই অনুপ্রাণিত হন, যে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হইবার দৌড়ে তাঁহারা আমাদের ছায়া অনুসরণ করিতে থাকেন। অতএব, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়াছি—আমাদের ক্রিকেট দল শুধু দেশে খেলিবে এবং খেলিবে এমনভাবে, যেন প্রতিপক্ষ জয় পাইয়া লজ্জায় মুখ লুকাইতে বাধ্য হয়।

 

আমাদের জাত্যাভিমান এতই প্রবল, যে আমরা নিম্নজাতের বিশ্বের সাথে তাল মেলাইতে পারি না। তাঁহারা যখন জলবায়ু সম্মেলনে যান, আমরা যাই মঙ্গল গ্রহে। তাঁহারা যখন চাঁদে ঘর বানান, আমরা বানাই “মঙ্গলাবাস আবাসন প্রকল্প”—যাহা তদারকি করিতেছে আমাদের গৃহায়ণ মন্ত্রণালয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে মঙ্গল গ্রহে দূতাবাস স্থাপনের জন্য জমি খুঁজিতেছে এবং তাঁহারা বলিয়াছেন—“যদি পৃথিবী আমাদের বুঝিতে না পারে, তবে আমরা গ্রহ বদলাইব।”

 

এই একলা চলো নীতির ফলে আমরা এমন এক জাতিতে পরিণত হইয়াছি, যাহারা নিজেরাই নিজেদের জন্য আইন বানায়, নিজেরাই নিজেদের প্রশংসা করে এবং নিজেরাই নিজেদের পুরস্কার দেয়। আমাদের জাতীয় পুরস্কার এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছাইয়াছে, যাহা পাইবার জন্য মানুষকে কিছু করিতে হয় না—শুধু বাংলাদেশী হইলেই যথেষ্ট।

 

বিশ্ব যখন আমাদের দিকে চাহিয়া বলে, “তোমরা কী করিতেছ?”, আমরা বলি, “আমরা করিতেছি, কিন্তু তোমরা বুঝিবে না।” এই রহস্যময়তা আমাদের শ্রেষ্ঠত্বের অন্যতম স্তম্ভ। আমরা এমন এক জাতি, যাহারা ব্যর্থতাকে সাফল্য বলিয়া চালাইতে জানে এবং জানে কীভাবে ব্যর্থতার মধ্যেও বিজয়ের পতাকা উড়াইতে হয়।

 

তাই আসুন, আমরা আর বিশ্বকে অনুসরণ না করি। বরং বিশ্ব আমাদের অনুসরণ করুক। আমরা একলা চলিব, একলা বলিব, একলা খেলিব, একলা হাসিব এবং একলা মঙ্গল গ্রহে গিয়া বসবাস করিব। কারণ আমরা বাংলাদেশী—আমরা শ্রেষ্ঠ, আমরা একা এবং আমরা অদ্বিতীয়।

 

লেখকঃ এক ক্লান্ত পেনসিল - যে নিজের ও দেশের মঙ্গল চিন্তায় ব্যাকুল

সব খবর