দেশের জ্বালানি সংকটের এই কঠিন সময়ে আবারও কার্যকর হিসেবে সামনে এসেছে বাংলাদেশ–ভারত মৈত্রী পাইপলাইন প্রকল্প, যা একসময় তীব্র সমালোচনা ও গুজবের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। অথচ বাস্তবতা বলছে, আজ সেই পাইপলাইনই দেশের উত্তরাঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করে অর্থনীতি, কৃষি ও পরিবহন খাত সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সম্প্রতি এই পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রায় ৫ হাজার টন ডিজেল আমদানি করা হয়েছে, যা প্রমাণ করে প্রকল্পটির বাস্তব কার্যকারিতা। বিশেষ করে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং সরবরাহ সংকটের প্রেক্ষাপটে এই অবকাঠামো এখন দেশের জন্য এক ধরনের “লাইফলাইন” হিসেবে কাজ করছে।
গুজব থেকে বাস্তবতায়
একসময় এই পাইপলাইন নিয়ে ‘ভারতে গ্যাস পাচার’সহ নানা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়েছিল। রাজনৈতিক মহলের একটি অংশ প্রকল্পটির বিরোধিতা করলেও বাস্তব প্রয়োজনে এখন সেই একই পক্ষকেও এর সুবিধা নিতে দেখা যাচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি প্রমাণ করে যে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো সময়ের সঙ্গে সঠিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
প্রকল্পের কাঠামো ও সক্ষমতা
বাংলাদেশ–ভারত ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইনটি ভারতের আসামের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে দিনাজপুরের পার্বতীপুর ডিপো পর্যন্ত প্রায় ১৩১.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ। এর মধ্যে ১২৬ কিলোমিটার বাংলাদেশের ভেতরে এবং ৫ কিলোমিটার ভারতের অংশে অবস্থিত।

২০১৭ সালে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের পর ২০২০ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং ২০২৩ সালের ১৮ মার্চ বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যৌথভাবে এর উদ্বোধন করেন। পাইপলাইনটির বার্ষিক পরিবহন সক্ষমতা প্রায় ১ মিলিয়ন মেট্রিক টন ডিজেল।
কৃষি ও উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে প্রভাব
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল বিশেষত দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম—দেশের খাদ্য উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। বোরো মৌসুমে এই অঞ্চলে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ডিজেলের প্রয়োজন হয়, যা মূলত সেচের কাজে ব্যবহৃত হয়।
এর আগে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সড়ক বা রেলপথে ডিজেল পরিবহন করতে সময় ও খরচ—দুটোই বেশি লাগত। পাইপলাইন চালু হওয়ার ফলে সরবরাহ সময় কমেছে, পরিবহন ব্যয় কমেছে এবং দ্রুত জ্বালানি পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। এতে কৃষি উৎপাদন স্থিতিশীল রাখতে বড় ভূমিকা রাখছে এই প্রকল্প।
অর্থনৈতিক সাশ্রয় ও দক্ষতা
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আগে প্রতি ব্যারেল ডিজেল পরিবহনে প্রায় ৬.৬ ডলার খরচ হতো, যা পাইপলাইন চালুর পর কমে প্রায় ৫.৫ ডলারে নেমে এসেছে। বড় পরিসরে আমদানির ক্ষেত্রে এই সাশ্রয় বছরে কয়েক কোটি ডলারের অর্থনৈতিক সুবিধা তৈরি করতে পারে।
এছাড়া পাইপলাইনের মাধ্যমে সরাসরি সরবরাহ হওয়ায় জ্বালানি অপচয় ও পরিবহনজনিত ঝুঁকিও কমে গেছে।
ভূরাজনীতি ও আঞ্চলিক সহযোগিতা
এই পাইপলাইন শুধু অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়ায় জ্বালানি সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে এটি। ভারত নিজেকে আঞ্চলিক জ্বালানি সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাইলেও বাংলাদেশ এ সুযোগকে ব্যবহার করছে নিজের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একক উৎসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বহুমুখী জ্বালানি উৎস নিশ্চিত করাই বর্তমান সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ। সেই দিক থেকে এই পাইপলাইন একটি কার্যকর বিকল্প পথ তৈরি করেছে।
সংকটকালে কার্যকারিতা
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের বিঘ্ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের উত্থান-পতনের মধ্যে পাইপলাইনটি দেশের জন্য একটি স্থিতিশীল সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করছে।
ইতোমধ্যে কয়েক দফায় উত্তরাঞ্চলের জ্বালানি সংকট এই পাইপলাইনের মাধ্যমে সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছে। পার্বতীপুর ডিপো থেকে আটটি জেলায় সরাসরি ডিজেল সরবরাহ করা হচ্ছে, যা সেচ মৌসুমে কৃষকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উন্নয়ন দর্শনের প্রতিফলন
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রকল্প শেখ হাসিনার উন্নয়ন দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। আঞ্চলিক সহযোগিতা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করার যে কৌশল, তারই অংশ এই পাইপলাইন।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জ্বালানি এখন কেবল একটি পণ্য নয়; এটি রাষ্ট্রের কৌশলগত শক্তির অন্যতম উপাদান। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশ–ভারত মৈত্রী পাইপলাইন দেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে।
সামনে কী?
যদিও পাইপলাইনের পূর্ণ সক্ষমতা এখনো পুরোপুরি ব্যবহার করা হয়নি, তবে ভবিষ্যতে সংরক্ষণ ও বিতরণ অবকাঠামো উন্নত করা গেলে এর কার্যকারিতা আরও বাড়বে।
নীতিনির্ধারকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার মাধ্যমে এই প্রকল্পকে আরও কার্যকর করা সম্ভব।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশ–ভারত মৈত্রী পাইপলাইন এখন শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, কৃষি উৎপাদন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি।
একসময় বিতর্কিত এই উদ্যোগ আজ বাস্তবতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রমাণ করেছে—দূরদর্শী পরিকল্পনা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতাই হতে পারে একটি দেশের টেকসই উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি।