অদ্যকার বাংলাদেশ এক অভিনব রূপ ধারণ করিয়াছে যাহাকে কেহ কেহ ‘নৈরাজ্য’ বলিয়া অভিহিত করিতেছেন, আর আমরা সাধারণ জনগণ তাহাকে স্নেহভরে বলিতেছি “স্বাধীনতার পূর্ণাঙ্গ স্বাদ”। এতকাল আমরা শৃঙ্খলার যাঁতাকলে পিষ্ট হইয়া কেবলই নিয়ম, আইন, জবাবদিহিতা প্রভৃতির বোঝা বহন করিয়াছি। এখন সেই শৃঙ্খল হইতে মুক্ত হইয়া, মবের গণতন্ত্রে আমরা অবশেষে মুক্ত বায়ু গ্রহণ করিতেছি।
বিচারব্যবস্থার কথাই ধরা যাক। পূর্বে আদালত, আইনজীবী, সাক্ষ্যপ্রমাণ এই সকল জটিল প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষ ক্লান্ত হইয়া পড়িত। এখন আর সেই ঝামেলা নাই। রাস্তায় দাঁড়াইয়া দশজন মানুষ মিলে যাহাকে দোষী বলিবে, সে-ই দোষী। বিচার দ্রুত, শাস্তি ত্বরিত—গণতন্ত্রের এমন কার্যকর প্রয়োগ আর কোথায় দেখা যায়? ইহা সত্যই এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
ধর্মীয় উগ্রবাদ প্রসঙ্গে কিছু না বলিলেই নহে। পূর্বে ধর্ম ছিল ব্যক্তির আত্মিক সাধনার বিষয়; এখন তাহা সামাজিক শৃঙ্খলার রক্ষাকবচে পরিণত হইয়াছে। কে কি পরিধান করিবে, কি বলিবে, কোথায় যাইবে এই সকল বিষয়ে সদা সতর্ক দৃষ্টি রাখিতেছেন ধর্মপ্রাণ নাগরিকবৃন্দ। সমাজে এতখানি দায়িত্ববোধ আর কবে দেখা গিয়াছে?
অর্থনীতির দিকে তাকাইলেই বোঝা যায়, আমরা কতদূর অগ্রসর হইয়াছি। বাজারে পণ্য নাই, অতএব, মানুষ অপ্রয়োজনীয় ভোগবিলাস হইতে মুক্ত। পেট্রোল পাম্পে জ্বালানি নাই, অতএব, পরিবেশ দূষণ কমিতেছে। মাঠে সেচের পানি নাই, অতএব, কৃষক প্রকৃতির উপর নির্ভর করিতে শিখিতেছে। ইহা কি টেকসই উন্নয়নের এক নতুন দিগন্ত নহে?
শিশুদের টিকা না থাকায় মৃত্যু ঘটিতেছে ইহা শুনিয়া কেহ কেহ ব্যথিত হইতে পারেন। কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করিলে বুঝা যায়, ইহা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের এক স্বাভাবিক পদ্ধতি। সরকারের অতিরিক্ত উদ্যোগের প্রয়োজন কোথায়? প্রকৃতি নিজেই কাজ করিতেছে।
শিক্ষাব্যবস্থার কথাও উল্লেখযোগ্য। নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নাই, অতএব, শিক্ষার্থীরা স্বাধীনভাবে ভাবিবার সুযোগ পাইতেছে। পাঠ্যসূচির কঠোরতা না থাকায় সৃজনশীলতা বাড়িতেছে। কে জানে, এই বিশৃঙ্খলার মধ্য হইতেই হয়তো একদিন কোনো মহাপুরুষের আবির্ভাব ঘটিবে!
এখন আসিতেছে বাজেটের সময়। জনগণ আতঙ্কিত, এ কথা সত্য। কিন্তু ভয়ই উন্নয়নের প্রথম ধাপ। আয় কমিতেছে, কর্মসংস্থান হ্রাস পাইতেছে, অতএব, মানুষ আত্মনির্ভর হইবার শিক্ষা পাইতেছে। চাঁদাবাজি যে বৃদ্ধি পাইতেছে, ইহা আসলে এক বিকল্প করব্যবস্থা, যাহা সরাসরি জনগণের নিকট হইতে সংগ্রহ করা হয়।
একদা বলা হইত, রাষ্ট্রের সকল সেবা জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত। কেহ কেহ বলিতেন, ইহা কোনো ব্যক্তির দয়া নহে। এখন দেখা যাইতেছে ট্যাক্সও যাইতেছে, সেবাও যাইতেছে। অর্থাৎ, আমরা এক উচ্চতর দার্শনিক স্তরে উপনীত হইয়াছি, যেখানে প্রত্যাশা নামক বস্তুটির বিলুপ্তি ঘটিয়াছে।
সংসদে প্রতিনিধিগণের কুশল বিনিময় ও বাহাস দেখিয়া জনগণ ক্রুদ্ধ হইতেছে ইহাও অমূলক নহে। কিন্তু ভাবিয়া দেখুন, এই বিনোদনের সুযোগ আর কোথায় মিলিবে? বাস্তব জীবনের দুঃখ-কষ্ট ভুলিয়া কিছু সময়ের জন্য এই নাট্যমঞ্চ আমাদের হাস্য ও বিস্ময়ের খোরাক জোগাইতেছে।
অতএব, বলা যাইতে পারে, আমরা এক স্বর্ণযুগে প্রবেশ করিয়াছি। যেখানে আইন নাই, কিন্তু শাস্তি আছে; শৃঙ্খলা নাই, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ আছে; সেবা নাই, কিন্তু কর আছে। ইহাই সেই বাংলাদেশ, যাহার জন্য আমরা এতদিন অপেক্ষা করিয়াছিলাম; একটি দেশ, যেখানে প্রত্যাশা কম, বিস্ময় বেশি।
এবং আমরা, এই দেশের সাধারণ মানুষ, নীরবে, নিঃশব্দে, গভীর তৃপ্তির সহিত উপভোগ করিতেছি নৈরাজ্যের এই অনুপম রাজত্ব।