সর্বশেষ

মতামত

আক্ষরিক অর্থেই দাসত্বের চুক্তি

প্রকাশিত: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০
আক্ষরিক অর্থেই দাসত্বের চুক্তি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বহুল আলোচিত স্লোগান, “আমেরিকা ফার্স্ট”। দ্বিতীয় মেয়াদে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার চার মাসেরও কম সময়ের মধ্যে সে স্লোগান বাস্তবায়ন করতে বিশ্বের প্রায় সকল দেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের উপর বিভিন্ন হারে বিদ্যমান শুল্কের সঙ্গে অতিরিক্ত পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এই পাল্টা শুল্ক আরোপের আগে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানিকৃত পণ্যের উপর আমেরিকার গড় শুল্ক হার ছিল ১৫.৫ শতাংশ। এর সঙ্গে অতিরিক্ত ৩৭ শতাংশ পাল্টা শুল্ক যা প্রতিযোগী ভারত, পাকিস্তান, চীন, ভিয়েতনাম, ইত্যাদি দেশের চাইতে বেশি। 

 

পাল্টা শুল্ক আরোপ করার পর বাংলাদেশী পণ্যের উপর আমেরিকার মোট শুল্ক দাঁড়ায় ৫২.৫ শতাংশ। দেশের রপ্তানি পড়ে হুমকির মুখে। সে অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য ডঃ মুহাম্মদ ইউনূসের অনির্বাচিত এবং অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকার ওয়াশিংটনের সঙ্গে দেনদরবার করে এক গোপন চুক্তির (Non-Disclosure Agreement বা NDA) বিনিময়ে গত বছরের আগস্ট মাসে পাল্টা শুল্ক ৩৭ থেকে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনে। NDA-তে কি কি বিষয় আছে তা আজ পর্যন্ত দেশবাসীকে জানানো হয়নি। 

 

২০ শতাংশে পাল্টা শুল্ক নামানোর পড়েও তা প্রতিযোগীদের তুলনায় বেশি হওয়ায় তা আরও কমানোর জন্য ওয়াশিংটনের সঙ্গে দেনদরবার চলতে থাকে। সবশেষে এ মাসের ৯ তারিখ ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ ও আমেরিকার মধ্যে Reciprocal Trade (Agreement) নামে একটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর হয়। আমেরিকার পক্ষে বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার এবং বাংলাদেশের পক্ষে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন এ চুক্তি স্বাক্ষর করেন। চুক্তির অংশ হিসেবে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি রপ্তানির উপর পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ২,৫০০ বাংলাদেশি পণ্যে শুল্কমুক্ত বা অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার দেবে। অন্যদিকে, ঢাকা একই শর্তে প্রায় ৪,৪০০ আমেরিকান পণ্যের জন্য তার বাজার উন্মুক্ত করবে। এ তালিকায় মার্কিন রাসায়নিক, চিকিৎসা সরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি, মোটরযান এবং যন্ত্রাংশ; তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সরঞ্জাম; গরুর মাংস, হাঁস-মুরগি, বাদাম এবং ফলমূল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। 

 

এ ছাড়াও এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত আরও অনেক বিষয়ের মধ্যে কয়েকটি এখানে উল্লেখ করা হলোঃ ১) বাংলাদেশকে ১৫ বিলিয়ন ডলারের তরলগ্যাস, ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের কৃষি পণ্য এবং ৩ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ১৪টি বোয়িং বিমান কিনতে হবে; ২) বাংলাদেশকে পাঁচ থেকে দশ বছরের জন্য বেশ কয়েকটি মার্কিন পণ্যের উপর শূন্য শুল্ক আরোপ করতে হবে এবং অন্যান্য কিছু পণ্যের উপর বিদ্যমান শুল্ক ৫০ শতাংশ কমাতে হবে; ৩) রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চলের জন্য শ্রম আইনে পরিবর্তন করে আমেরিকার মনোপুত করতে হবে; ৪) বন্দর, টার্মিনাল এবং শিপিং বহরের ডিজিটাল লজিস্টিক প্ল্যাটফর্ম এমনভাবে পরিবর্তন করতে হবে যা কেবল সাইবার-সুরক্ষিতই নয় বরং অন্যান্য বিদেশী সরকারগুলিকে তথ্য প্রবাহ করা থেকে বিরত রাখবে; ৫) আমেরিকায় উৎপত্তি এবং আমেরিকা নিয়ন্ত্রিত পণ্যের রপ্তানি, পুনঃরপ্তানি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে; ৬) আমদানি ও রপ্তানির সকল তথ্যে আমেরিকার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে; ৭) মেধাস্বত্বসহ বিশ্ব বাণিজ্যের ১২টি চুক্তিতে স্বাক্ষর বা সম্মত থাকতে হবে; ৪) ওষুধসহ আমেরিকা থেকে আমদানিকৃত পণ্যের মাননিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না, আমেরিকা যা করবে তাই শেষ কথা; ৫) গাড়িসহ রিকণ্ডিশন যন্ত্রপাতি আমদানির উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে; ৬) এ চুক্তির কোন অনুচ্ছেদের বিরুদ্ধে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় প্রতিকার চাওয়া যাবে না; ইত্যাদি। 

 

এ চুক্তিতে আরও যে সকল ভয়াবহ এবং সে কারণেই অগ্রহণযোগ্য শর্তাবলী রয়েছে তার কয়েকটি এখানে উল্লেখ করা হলোঃ ১) বাংলাদেশ আমেরিকা ব্যতীত অন্য কোন দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি, পারমাণবিক জ্বালানি রড অথবা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কিনতে পারবে না যা "মার্কিন স্বার্থকে বিপন্ন করে”। ফলে রাশিয়ার তৈরি বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় কোন কিছু রাশিয়া থেকে কেনা যাবে না। ২) রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য (FTA) কিংবা অগ্রাধিকারভিত্তিতে কোন অর্থনৈতিক চুক্তি করা যাবে না। ৩) যদি আমেরিকা তার নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার জন্য সীমান্ত ব্যবস্থা বা বাণিজ্য পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করে, তাহলে বাংলাদেশ "পরিপূরক বিধিনিষেধমূলক ব্যবস্থা" গ্রহণ করতে বাধ্য থাকবে। 

 

আমেরিকার সঙ্গে সদ্য সম্পাদিত এ চুক্তির ফলে বাংলাদেশ এক শতাংশ শুল্ক হ্রাস করতে পেরেছে বৈকি। তবে এর বিনিময়ে অনির্দিষ্ট কালের জন্য কৃষি সমৃদ্ধ বাংলাদেশকে এখন আন্তর্জাতিক মূল্যের চাইতেও বেশি দামে কৃষি পণ্য, জ্বালানী এবং অন্যান্য শিল্প পণ্য কিনতে বাধ্য করা হবে যাতে অর্থনৈতিকভাবে উদীয়মান দেশটির শিল্প উন্নতি বাঁধাগ্রস্থ হবে। এই এক শতাংশের বিনিময়ে যে সকল শর্ত মেনে নিতে হয়েছে তার অর্থনৈতিক মূল্য কি সত্যিই তার সুবিধার চেয়ে বেশি? এই প্রশ্নের উত্তর এত স্বল্প পরিসরে দেয়া সম্ভব নয়। এর জন্য বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত নিয়ে গবেষণা দরকার। সার্বিকভাবে মূল্যায়ন করলে দেখা যায় এ চুক্তি পোশাক শিল্পের জন্য সামান্য সুবিধা দিলেও বাংলাদেশের জন্য একটি বাধ্যতামূলক কাঠামো তৈরি করেছে যা দেশটির প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, বাণিজ্য এবং ডিজিটাল অবকাঠামোকে আমেরিকার নিয়ন্ত্রণাধীন করে ফেলেছে। আমেরিকার সম্মতি ছাড়া এখন অন্য কোন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা, কূটনৈতিক কিংবা অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবে না। এই চুক্তি যে দীর্ঘ মেয়াদের জন্য দেশের প্রতিরক্ষা, কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক দাসত্বের জালে বন্দি করে ফেলেছে তা নিশ্চিন্তে বলা যায়। মহাপরাক্রমশালী যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষর করা এ চুক্তির রদবদল যে আগামী সরকারগুলো করতে পারবে এমন সম্ভাবনা দূর দিগন্তেও দেখা যাচ্ছে না। 

 

জন্মের পড় থেকে শুনে এসেছি দেশ বিক্রি করা ২৫ বছরের গোলামী চুক্তির কথা। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর, উভয় দেশ তাদের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে আনুষ্ঠানিকভাবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে। যুদ্ধের সময় ভারত বাংলাদেশকে সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে সমর্থন করেছিল। দুই দেশের জনগণ সে যুদ্ধের জন্য প্রাণ দিয়েছিল। সে সময়ে ঢাকার নতুন সরকার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে সহায়তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছিল। 

 

এমন প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে ১০ জানুয়ারি দেশে ফেরার তিন মাসেরও কম সময়ের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭২ সালের ১৯ মার্চ ঢাকায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির সঙ্গে দুই দেশের মধ্যকার পারস্পরিক বন্ধুত্ব; শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান; একে অন্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা; শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তা রক্ষা করা; আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা; রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ক্রীড়া, ইত্যাদি ক্ষেত্রে সহযোগিতা; কোন আন্তর্জাতিক জোট ভুক্ত না হওয়া; এক দেশ অন্য দেশের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত না হওয়া; ইত্যাদি বিষয়ে যে চুক্তি সম্পাদন করেছিল তা ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চুক্তি নামে পরিচিত। এ চুক্তিতে কোন বাণিজ্য কিংবা সম্পত্তি লেনদেনের বিষয় ছিল না। তবুও মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি এ চুক্তিকে পঁচিশ বছরের গোলামী চুক্তি অভিধা দিয়ে এ দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে, বহু বছর রাজনীতি করেছে। এখনো করছে। এ চুক্তির কোন অনুচ্ছেদ জাতীয় স্বার্থ বিরোধী কিংবা কোন অনুচ্ছেদ দ্বারা গোলামী নিশ্চিত করা হয়েছে – মুক্তিযুদ্ধ বিধোধীদের এমন প্রশ্ন করা হলে তারা কখনোই সে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি। তবুও অপপ্রচারটা চালিয়ে গেছে। 

 

ডঃ ইউনূসের জঙ্গি-সামরিক যৌথবাহিনী '২৪ সালের ৫ আগস্ট জঙ্গি হামলা চালিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করার পর বিদেশীদের কাছে আন্তর্জাতিক দরপত্র ছাড়া নামমাত্র মূল্যে একের পর এক বন্দর বিক্রি করে দেয়া; জাতীয় নিরাপত্তা বিবেচনা না করে স্টারলিংককে একচেটিয়ে ব্যবসা করতে দেয়া যা সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করছে মায়ানমারের বিদ্রোহীরা; পার্শবর্তী দেশ মায়ানমারের বিদ্রোহীদের জন্য করিডোর দেয়ার অপচেষ্টা করা; বিনা অনুমতিতে মার্কিন সৈনিকদের বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করতে দেয়া; এবং সর্বশেষ অনির্দিষ্ট কালের জন্য আমেরিকার সঙ্গে দেশের নিরাপত্তা, কূটনীতি এবং অর্থনীতির দাসত্ব চুক্তি করে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ডঃ মুহাম্মদ ইউনূস বহুকালের জন্য বাংলাদেশের জনগণকে অশান্তির নিগড়ে বেঁধে রেখে যাচ্ছেন। এর থেকে পরিত্রাণ সহসা মিলবে না।

সব খবর