রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে এলপিজি গ্যাসের বাজারে চরম নৈরাজ্য দেখা দিয়েছে। সরকার ও প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান চললেও অসাধু ব্যবসায়ীরা তা কার্যত উপেক্ষা করছেন। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নির্ধারিত দামের তোয়াক্কা না করে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে দ্বিগুণ দামে—২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। ফলে ভোক্তাদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গ্রাহক সেজে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ দোকানেই নির্ধারিত দামের কথা বললে বিক্রেতারা কথা না বলেই ফোন কেটে দিচ্ছেন। ধানমন্ডির মধুবাজার এলাকার ‘তাকওয়া এন্টারপ্রাইজ’-এ জানানো হয়, তাদের কাছে গ্যাস নেই, আনতে পাঠানো হয়েছে। গত কয়েক দিন তারা ২ হাজার ৪০০–২ হাজার ৫০০ টাকায় গ্যাস বিক্রি করেছেন বলে স্বীকার করেন। দাম বেশি কেন—এমন প্রশ্নে দোকানির জবাব, “গ্যাসই নাই, আমরা কী করবো?”
বনশ্রীসহ অন্যান্য এলাকাতেও একই চিত্র। অভিযানের ভয়ে অনেক দোকান বন্ধ রাখা হলেও পরিচিত গ্রাহকদের ফোন পেলে বাড়তি দামে বাসায় গ্যাস পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। তবে এই নৈরাজ্যের মধ্যেও ব্যতিক্রমী চিত্র দেখা গেছে। বাড্ডার বেরাইদ এলাকায় ‘মুক্তিযোদ্ধা এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি দোকান ১২ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৩৫০ টাকায় বিক্রি করেছে—এ সংক্রান্ত মানি রিসিট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এক গ্রাহক জানান, দীর্ঘ সময় ঘুরে অবশেষে তিনি সেখানে ন্যায্যমূল্যে গ্যাস পেয়েছেন। এতে প্রশ্ন উঠেছে—এক দোকানি যদি নির্ধারিত দামে বিক্রি করতে পারেন, অন্যরা কেন দ্বিগুণ দাম নিচ্ছেন?
এলপিজির অতিরিক্ত দাম রুখতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছে। ভোক্তারা একে অপরকে বাড়তি দামে গ্যাস না কেনার এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরে অভিযোগ করার আহ্বান জানাচ্ছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রশাসনিক অভিযান কার্যকর না হওয়ায় সামাজিক প্রতিরোধ ও সচেতনতার বিকল্প নেই।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই এলপিজি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি ছয় দফা দাবিতে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছে। বুধবার (৭ জানুয়ারি) জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির সভাপতি মো. সেলিম খান জানান, কমিশন বৃদ্ধি, বিইআরসির একতরফা দাম ঘোষণা বন্ধসহ দাবিগুলো মানা না হলে বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য এলপিজি সরবরাহ ও বিপণন বন্ধ করা হবে। তিনি বলেন, দেশে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি সিলিন্ডার থাকলেও বর্তমানে মাত্র ১ কোটি ২৫ লাখ সিলিন্ডারে গ্যাস রিফিল হচ্ছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম।
জ্বালানি উপদেষ্টা ফওজুল কবীর খান জানিয়েছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে, অভিযান ও জরিমানা বাড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) দাবি করেছে, খুচরা পর্যায়ের সুযোগসন্ধানীরাই মূলত দামের কারসাজি করছে। তবে বাস্তবে অভিযান ও ঘোষণার মধ্যেও এলপিজির দাম নিয়ন্ত্রণে আসছে না—ভোগান্তিই বাড়ছে সাধারণ মানুষের।