বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে ১৯৭১ সাল এক গভীর রক্তাক্ত অধ্যায়। নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ, লাখো মানুষের প্রাণহানি এবং ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ। কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেই গণহত্যার জন্য পাকিস্তানের আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা আজও অধরা যা দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম অমীমাংসিত প্রশ্ন হয়ে আছে।
‘দুঃখ প্রকাশ’, কিন্তু ক্ষমা নয়
স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ সরকার বারবার পাকিস্তানের কাছে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনার দাবি জানিয়ে আসছে। তবে পাকিস্তান ধারাবাহিকভাবে ‘ক্ষমা’ শব্দটি এড়িয়ে গেছে। পরিবর্তে তারা ‘দুঃখ প্রকাশ’, ‘অনুশোচনা’ কিংবা ‘অতীত ভুলে যাওয়ার’ মতো কূটনৈতিক ভাষা ব্যবহার করে বিষয়টি পাশ কাটানোর চেষ্টা করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভাষাগত কৌশল কোনো রাষ্ট্রের দায় স্বীকার না করে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার একটি পরিচিত পদ্ধতি। ফলে ‘ক্ষমা’ না চেয়ে ‘দুঃখ’ প্রকাশের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান কার্যত দায় এড়ানোর অবস্থান ধরে রেখেছে।
১৯৭৪: ভুট্টোর সফর ও অপূর্ণ প্রত্যাশা
১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো-এর ঢাকা সফর ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। স্বাধীন বাংলাদেশে কোনো পাকিস্তানি সরকারপ্রধানের এটিই ছিল প্রথম সফর। এর আগে দিল্লিতে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলেও গণহত্যার দায় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি।

ঢাকায় এসে ভুট্টো একাত্তরের ঘটনাকে ‘বেদনাদায়ক’ বলে উল্লেখ করেন, কিন্তু সরাসরি ক্ষমা চাননি। বরং ‘ইসলামী ভ্রাতৃত্বের’ কথা বলে অতীত ভুলে যাওয়ার আহ্বান জানান। একইসঙ্গে সম্পদ বণ্টন ও আটকে পড়া পাকিস্তানিদের প্রত্যাবাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোও তিনি এড়িয়ে যান।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান এসব বিষয়ে স্পষ্ট দাবি তুললেও কোনো সমাধান ছাড়াই সফর শেষ হয়।
হামুদুর রহমান কমিশন: গোপন সত্যের আড়াল
১৯৭১ সালের যুদ্ধের পর পাকিস্তান সরকার একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে, যা ‘হামুদুর রহমান কমিশন’ নামে পরিচিত। এই কমিশনের প্রতিবেদনে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর গুরুতর অপরাধের প্রমাণ উঠে আসে। কিন্তু প্রতিবেদনটি প্রকাশ না করে গোপন রাখা হয়, এমনকি ধ্বংস করার অভিযোগও রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রতিবেদন প্রকাশ পেলে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পাকিস্তানকে দায় স্বীকার করতে হতো যা তারা এড়িয়ে যেতে চেয়েছে।
২০০২: মোশাররফের ‘বাড়াবাড়ি’ তত্ত্ব
২০০২ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ বাংলাদেশ সফরে এসে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানান। তিনি ১৯৭১ সালের ঘটনাকে ‘দুঃখজনক’ ও ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলে উল্লেখ করেন।

তবে তিনি গণহত্যার স্বীকৃতি দেননি; বরং ‘বাড়াবাড়ি’ শব্দ ব্যবহার করেন। এই শব্দচয়ন ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। কারণ এটি পরিকল্পিত গণহত্যাকে ছোট করে দেখানোর একটি প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হয়।

কূটনৈতিক বিতর্ক ও অস্বস্তি
বিভিন্ন সময়ে পাকিস্তানি কূটনীতিকদের মন্তব্য দুই দেশের সম্পর্ককে আরও জটিল করেছে। ২০০০ সালে ঢাকায় পাকিস্তানের এক কূটনীতিক শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুললে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে তাকে প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় পাকিস্তান।

এছাড়া যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময় পাকিস্তান প্রকাশ্যে বিরোধিতা করে এবং দণ্ড কার্যকরের পর তাদের সংসদে নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ করে। এতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিচার প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
২০১২: একই সুর, একই অবস্থান
২০১২ সালে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিনা রাব্বানি খার ঢাকা সফরে এসে আবারও ‘অতীত ভুলে সামনে তাকানোর’ আহ্বান জানান। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে গণহত্যার দায় স্বীকার ও ক্ষমা চাওয়ার দাবি পুনর্ব্যক্ত করা হলেও তিনি সেটি এড়িয়ে যান।

ইমরান খানের আংশিক স্বীকারোক্তি
২০২২ সালে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এক জনসভায় স্বীকার করেন, ১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানের ওপর ‘অবিচার’ করেছে। তবে তিনি ক্ষমতায় থাকাকালে এমন বক্তব্য দেননি, এবং এটিও ছিল ব্যক্তিগত পর্যায়ের মন্তব্য—রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নয়।

২০২৫: ইসহাক দারের দাবি
২০২৫ সালে পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার ঢাকা সফরে এসে দাবি করেন, ১৯৭৪ সালের চুক্তি ও ২০০২ সালের সফরের মাধ্যমেই বিষয়টির ‘নিষ্পত্তি’ হয়ে গেছে। তবে বাংলাদেশ এই দাবিকে গ্রহণ করেনি।
কারণ এখন পর্যন্ত পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সংসদীয় প্রস্তাব পাস করেনি, কিংবা লিখিতভাবে ক্ষমা চায়নি।

পাঠ্যপুস্তক ও রাষ্ট্রীয় বয়ান
পাকিস্তানের সরকারি পাঠ্যপুস্তক ও সামরিক জাদুঘরে ১৯৭১ সালের ঘটনাকে প্রায়ই ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এমনকি মুক্তিযোদ্ধাদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিত্রিত করার অভিযোগও রয়েছে। এই ধরনের রাষ্ট্রীয় বয়ান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে বিকৃত ইতিহাস প্রতিষ্ঠা করছে বলে মনে করেন গবেষকরা।
কেন ক্ষমা চায় না পাকিস্তান?
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের ক্ষমা না চাওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে:
অমীমাংসিত ক্ষত
বাংলাদেশের জন্য ১৯৭১ শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়—এটি জাতির আত্মপরিচয়ের অংশ। সেই গণহত্যার জন্য আনুষ্ঠানিক ক্ষমা না চাওয়া একটি গভীর ক্ষত হিসেবে রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রকৃত পুনর্মিলন ও আস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য পাকিস্তানের উচিত ইতিহাসের দায় স্বীকার করে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাওয়া। তা না হলে এই প্রশ্নটি দুই দেশের সম্পর্কের ছায়া হয়ে থেকে যাবে।