মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে আবারও অস্থির করে তুলেছে। যুদ্ধের ফলে একদিকে লাখ লাখ মানুষের জীবন ও জীবিকা হুমকির মুখে পড়ছে, অন্যদিকে তেল ও গ্যাসের আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিচ্ছে। এই অস্থিরতার মধ্যেই কিছু জ্বালানি কোম্পানি অপ্রত্যাশিতভাবে বড় ধরনের মুনাফার সুযোগ পাচ্ছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা পাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই জ্বালানি বাজারে প্রভাব বিস্তার বাড়াতে আগ্রহী। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনও জ্বালানি খাতে মার্কিন আধিপত্য শক্তিশালী করার নীতি অনুসরণ করে চলেছে। যদিও চলমান সংঘাতের সঙ্গে সেই নীতির সরাসরি কোনো সম্পর্ক আছে কি না তা স্পষ্ট নয়, তবু বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—এই সংকট থেকে কয়েকটি মার্কিন কোম্পানি লাভবান হওয়ার পথে রয়েছে।
বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান এনার্জি অ্যাসপেক্টস-এর প্রধান এলএনজি বিশ্লেষক টম পার্ডি বলেন, বর্তমানে বৈশ্বিক বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি রপ্তানিকারকদের অবস্থান সবচেয়ে শক্তিশালী। কারণ, সংঘাতের ফলে বিশ্ববাজারে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এলএনজি উৎপাদন কেন্দ্র হলো রাস লাফান প্ল্যান্ট, যা অবস্থিত কাতারে। এই কেন্দ্রটি সাধারণত বিশ্বব্যাপী এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জোগান দেয়। এখানকার গ্যাস জাহাজে পরিবহনের সুবিধার জন্য তরল আকারে রূপান্তর করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক হামলা ও নৌপথে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে কাতার কর্তৃপক্ষ এই প্ল্যান্ট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি শিল্প বড় সুযোগ পাচ্ছে। শেল গ্যাস উৎপাদনে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ফলে এখন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানিকারক। তবে তাদের আরেকটি বড় সুবিধা হলো—রপ্তানির একটি অংশ (১০ থেকে ১৫%) দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির বাইরে থাকে। ফলে এই গ্যাস তারা সরাসরি আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে বিক্রি করতে পারে।
সংঘাতের প্রথম সপ্তাহেই ইউরোপ ও এশিয়ার বাজারে গ্যাসের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানিকারক কোম্পানিগুলো এই বাড়তি দামের সুযোগে বেশি মুনাফা অর্জন করতে পারছে।
জ্বালানি বাজার বিশ্লেষণকারী আরেক প্রতিষ্ঠান এনার্জি ফ্লাক্স-এর একটি মডেল অনুযায়ী, সংঘাতের প্রথম মাসেই মার্কিন এলএনজি শিল্প প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের অতিরিক্ত মুনাফা করতে পারে। সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা সেব কেনেডি বলেন, সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হলে যেসব কোম্পানির হাতে অতিরিক্ত জ্বালানি সরবরাহের সক্ষমতা থাকে, বাজার তাদেরই সুবিধা দেয়।
ইতোমধ্যে কয়েকটি বড় কোম্পানির বাজারমূল্যও বাড়তে শুরু করেছে। উদাহরণ হিসেবে মার্কিন এলএনজি রপ্তানিকারক ভেঞ্চার গ্লোবাল এলএনজি-এর শেয়ারের দাম যুদ্ধ শুরুর প্রথম সপ্তাহেই প্রায় ২৮ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে চেনিয়ার এনার্জিরও শেয়ারের দামও প্রায় ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও এসব কোম্পানি আনুষ্ঠানিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, এই মুনাফা দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী নাও হতে পারে। কারণ বাজার যখন নিম্নমুখী হয়, তখন স্পট মার্কেট নির্ভর কোম্পানিগুলো বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়ে। তাছাড়া কাতারের মতো বড় উৎপাদক দেশ বাজারে ফিরলে সরবরাহ পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে যেসব দেশ নিরাপদ ও বাধাহীন সমুদ্রপথ ব্যবহার করে এলএনজি সরবরাহ করতে পারবে তারাই লাভবান হবে। এই তালিকায় অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, পেরু, মেক্সিকো ও আর্জেন্টিনার মতো দেশের নামও উল্লেখ করা হচ্ছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেও জ্বালানি বাজারের চাপ থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়। আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজারেও পেট্রলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। ফলে সাধারণ ভোক্তাদের ওপরও চাপ বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতির ওপরও আরও গভীর হতে পারে।