বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে ১৯৭১ সালে সংঘটিত নৃশংসতাকে আন্তর্জাতিকভাবে ‘গণহত্যা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে। গত ২০ মার্চ কংগ্রেস সদস্য গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান প্রতিনিধি পরিষদে এই প্রস্তাবটি উপস্থাপন করেন। বর্তমানে এটি বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক কমিটিতে পর্যালোচনার জন্য পাঠানো হয়েছে।
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা বাঙালি জনগণের ওপর পরিকল্পিতভাবে দমন-পীড়ন চালায়। এতে ব্যাপক প্রাণহানি, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি এবং নারী নির্যাতনের মতো ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে বাঙালি জনগোষ্ঠী এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে পরিচালিত এই সহিংসতাকে মানবতাবিরোধী গুরুতর অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে ২৫ মার্চ রাতে পরিচালিত ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়, যা ছিল বাঙালিদের দমন ও নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত একটি সুপরিকল্পিত সামরিক অভিযান। এই অভিযানে বুদ্ধিজীবী, শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক কর্মী এবং সাধারণ নাগরিকদের নির্বিচারে হত্যা করা হয়।
প্রস্তাবে ঐতিহাসিক দলিল-প্রমাণ হিসেবে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তৎকালীন মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাডের পাঠানো বিখ্যাত ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’, যেখানে পাকিস্তানি বাহিনীর কর্মকাণ্ডকে ‘নির্বাচিত গণহত্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় এবং মার্কিন প্রশাসনের নীরবতার সমালোচনা করা হয়।
এছাড়া ব্রিটিশ সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের ‘দ্য সানডে টাইমস’-এ প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের কথাও তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে পূর্ব পাকিস্তানে পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞের চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে আসে। একইভাবে, মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডির ১৯৭১ সালের প্রতিবেদনে সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর চালানো নির্যাতনের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে।
নারীদের ওপর সহিংসতার বিষয়টিও প্রস্তাবে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এতে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধের সময় দুই লাখেরও বেশি নারী ধর্ষণের শিকার হন, যা আন্তর্জাতিক আইনে গুরুতর মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচিত।
প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, তারা যেন আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৭১ সালের ঘটনাগুলোকে ‘গণহত্যা’, ‘যুদ্ধাপরাধ’ এবং ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। পাশাপাশি দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই ইতিহাস সংরক্ষণের ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
প্রস্তাবটি গৃহীত হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ১৯৭১ সালের ঘটনাবলিকে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে তা একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হবে। এতে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের দাবির প্রতি বৈশ্বিক সমর্থন আরও জোরদার হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।