বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে। বর্তমানে দেশের মোট উৎপাদিত গ্যাসের ৫৬ শতাংশই উত্তোলন করছে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি শেভরন। পাশাপাশি এলএনজি আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনাতেও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানিগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফলে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আবারও যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকছে বাংলাদেশ।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় গ্রিডে স্থানীয়ভাবে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হয়। এর মধ্যে শেভরন পরিচালিত গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকেই আসে ৯৬৪ মিলিয়ন ঘনফুট, যা মোট স্থানীয় উৎপাদনের অর্ধেকের বেশি। দেশের মোট গ্যাস সরবরাহ দৈনিক গড়ে ২ হাজার ৬৬০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি, যার প্রায় ৩৬ শতাংশ শেভরনের অংশ।
বিশেষ করে সিলেটের বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার প্রধান ভরসা হিসেবে কাজ করছে। দেশের মোট গ্যাস উত্তোলনের প্রায় ৪৮ শতাংশই আসে এ ফিল্ড থেকে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, দীর্ঘদিন উৎপাদনের কারণে বিবিয়ানার মজুদ ধীরে ধীরে কমছে। ফলে ভবিষ্যতে এ উৎস থেকে সরবরাহ কমে গেলে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।
শুধু গ্যাস উত্তোলন নয়, এলএনজি সরবরাহেও যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। কক্সবাজারের মহেশখালীতে দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটি পরিচালনা করছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক্সিলারেট এনার্জি। প্রতিষ্ঠানটি দৈনিক প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করতে সক্ষম। ২০১৮ সাল থেকে তারা পেট্রোবাংলার সঙ্গে চুক্তির আওতায় নিয়মিত গ্যাস সরবরাহ করে আসছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি পরিবহনে বিঘ্নের কারণে কাতার থেকে এলএনজি আমদানিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর ফলে দেশে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিকল্প উৎস খোঁজার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
সম্প্রতি ঢাকায় সফররত মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর এবং রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেনের সঙ্গে বৈঠকে জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, বর্তমান সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা কামনা করা হয়েছে এবং দীর্ঘমেয়াদে অংশীদারিত্ব জোরদারের কথাও বলা হয়েছে।
এর আগে ‘পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি’র আওতায় আগামী ১৫ বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন জ্বালানি আমদানির বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে, যা এই নির্ভরতা আরও বাড়াবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি উৎস বহুমুখীকরণ অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে জরুরি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল চুক্তির মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরাও বলছেন, জ্বালানি এখন কেবল অর্থনৈতিক বিষয় নয়, বরং কৌশলগত নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।